জীবনের কঠিন বাস্তবতা কখনো কখনো মানুষকে নতুন করে পথ খুঁজতে শেখায়। একসময় মহিষের খামারই ছিল যার স্বপ্ন আর জীবিকার অবলম্বন, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই খামারই বন্ধ করতে হয় রাকিবুল ইসলামকে। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে শরীরের বাঁ পাশ অবশ হয়ে যাওয়ায় থমকে যায় স্বাভাবিক জীবন। কিন্তু থেমে থাকেননি কুষ্টিয়ার এই উদ্যোক্তা। বরং দুম্বা পালনেই খুঁজে নিয়েছেন ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন গল্প।

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার সাহেবনগর গ্রামের ৩৬ বছর বয়সী রাকিবুলের পশুপালনের অভিজ্ঞতা অবশ্য নতুন নয়। প্রায় এক দশক ধরে মহিষের খামার পরিচালনা করে সংসার চালাতেন তিনি। তবে ২০২৩ সালের মার্চে হঠাৎ অসুস্থতা সব হিসাব পাল্টে দেয়। দীর্ঘ চিকিৎসায় কিছুটা সুস্থ হলেও আগের মতো শারীরিক পরিশ্রমের সামর্থ্য ফিরে পাননি। ফলে বাধ্য হয়েই বন্ধ করতে হয় প্রিয় মহিষের খামার। আর সেখান থেকেই শুরু হয় নতুন জীবিকার সন্ধান।

একপর্যায়ে পরিচিত একজনের পরামর্শে নাটোরের একটি দুম্বার খামারে গিয়ে খোঁজ নেন পালন পদ্ধতি ও সম্ভাবনা সম্পর্কে। সবকিছু বুঝে ২০২৪ সালের শুরুতে একটি দুম্বা ও একটি দুম্বী কিনে শুরু করেন নতুন উদ্যোগ। শুরুটা ছোট হলেও সম্ভাবনা ছিল বড়। ধীরে ধীরে বংশবিস্তার করে খামারে এখন ছোট-বড় মিলিয়ে দুম্বার সংখ্যা ১৫টি। যে উদ্যোগ একসময় ছিল কেবল টিকে থাকার চেষ্টা, সেটিই এখন রাকিবের স্বাবলম্বী হওয়ার বড় আশ্রয়।

আর এই খামার থেকে ইতোমধ্যে মিলেছে সাফল্যের বড় প্রমাণ। ছয়টি পূর্ণবয়স্ক দুম্বা বিক্রি করেই আয় করেছেন ১২ লাখ টাকা। একটি বাচ্চা দুম্বার বাজারমূল্য প্রায় এক লাখ টাকা, আর পূর্ণবয়স্ক দুম্বার দাম দুই থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত। শুধু বিক্রির অঙ্কই নয়, দুম্বা পালনের তুলনামূলক কম খরচও বাড়াচ্ছে এই খামারের সম্ভাবনা। কাঁচা ঘাস, খড়, ভুসি কিংবা ছোলার মতো সাধারণ খাবারেই বেড়ে ওঠে দুম্বা। নিয়মিত পরিচর্যা ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে পারলেই গড়ে তোলা সম্ভব লাভজনক খামার।

খামারের পরিচর্যাকারী সুজন হাসান জানান, দুম্বার খাবার ও দেখভালের জন্য খুব বেশি আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। সকালে খাবার দিয়ে বাইরে ঘাস খেতে ছেড়ে দেওয়া হয়, বিকেলে পানি ও প্রয়োজনীয় খাবার দেওয়া হয়। নিয়মিত গোসল করানো এবং থাকার জায়গা পরিষ্কার রাখলেই চলে। অন্যদিকে রাকিবের খামারে থাকা ১৫টি দুম্বার মধ্যে তিনটি শিগগিরই বাচ্চা দিতে যাচ্ছে। অর্থাৎ সামনে আরও বাড়তে পারে খামারের পরিধি। পাশাপাশি বাচ্চা দেওয়ার পরও মা দুম্বার দুধ সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে।

রাকিবের এই উদ্যোগকে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। প্রতিবেশী মাওলানা ইমরান হাসানের মতে, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও নিজের চেষ্টায় উপার্জনের পথ তৈরি করেছেন রাকিব। উপজেলা প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ডা. মো. আবদুল্লাহিল কাফিও মনে করেন, সঠিক পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনায় স্বল্প পরিসরেই দুম্বা পালন লাভজনক হতে পারে। সব মিলিয়ে একসময় যে অসুস্থতা রাকিবের জীবিকার পথ বন্ধ করে দিয়েছিল, সেই প্রতিকূলতাকেই জয় করে এখন নতুন স্বপ্ন বুনছেন তিনি। দুম্বার খামারে তার এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প যেন বলে দেয়, ইচ্ছাশক্তি থাকলে থেমে যাওয়া জীবনও আবার নতুন পথে ছুটতে পারে।