বিশ্বজুড়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি ‘নোবেল পুরস্কার’ ঘোষণার উৎসবমুখর সপ্তাহ শুরু হচ্ছে আজ সোমবার (৫ অক্টোবর) থেকে। প্রথা অনুযায়ী, আজ চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিজয়ী বা বিজয়ীদের নাম ঘোষণার মধ্য দিয়ে এবারের নোবেল সপ্তাহের পর্দা উঠবে। আগামী ১২ অক্টোবর পর্যন্ত প্রতিদিন পর্যায়ক্রমে মোট ছয়টি বিভাগে চলতি বছরের বিজয়ীদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশ করা হবে।

সুইডেনের স্টকহোম থেকে আজ চিকিৎসাবিজ্ঞানের পুরস্কারটি বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড় ৩টায় ঘোষণা করার কথা রয়েছে।

এবারের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পাওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে ওজন কমানোর বৈপ্লবিক ওষুধ ওজেম্পিক (Ozempic) ও মাউনজারো (Mounjaro)-র নেপথ্যের মৌলিক গবেষণা। নোবেল পর্যবেক্ষকদের প্রবল ধারণা, ক্ষুধা ও তৃপ্তি নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন এবং শরীরের বিপাকক্রিয়া সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলো এবার রাজকীয় স্বীকৃতি পেতে পারে।

বিশেষ করে, ‘গ্লুকাগন-লাইক পেপটাইড-১’ বা জিএলপি-১ (GLP-1) হরমোন নিয়ে গবেষণাটি প্রবলভাবে আলোচনায় রয়েছে। খাবার গ্রহণের পর শরীর থেকে স্বাভাবিকভাবে নিঃসৃত এই হরমোন ক্ষুধা ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে মূল ভূমিকা রাখে। ওজেম্পিকের মতো আধুনিক ওষুধগুলো মূলত এই জিএলপি-১-এর কার্যপ্রক্রিয়াকে কৃত্রিমভাবে অনুকরণ করে কাজ করে।

ডেটা বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ক্ল্যারিভেটের গবেষণা বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান ডেভিড পেন্ডলবেরি মনে করেন, বিশ্বজুড়ে চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব এবং জনপ্রিয়তার কারণে জিএলপি-১ গবেষণাই নোবেল জয়ের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। এই গবেষণার সাথে যুক্ত সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে কানাডার এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট ড্যানিয়েল ড্রাকার, ডেনমার্কের চিকিৎসক জেন্স জুয়েল হোলস্ট এবং যুগোস্লাভিয়ায় জন্ম নেওয়া মার্কিন রসায়নবিদ স্বেতলানা মোইসভের নাম জোরেশোরে আলোচনা হচ্ছে।

অবশ্য নোবেল কমিটি চমক দিয়ে ভিন্ন কোনো গবেষণাকেও বেছে নিতে পারে। সেক্ষেত্রে ত্বকের পুনর্জন্ম ও ক্ষত সারানোর প্রক্রিয়ায় স্টেম সেলের ভূমিকা নিয়ে গবেষণার জন্য মার্কিন কোষবিজ্ঞানী এলেইন ফুকস এবং ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ফিওনা ওয়াট সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছেন।

এ ছাড়া ‘অপটিক্যাল কোহেরেন্স টমোগ্রাফি’ (OCT) নামে একটি অত্যাধুনিক ইমেজিং প্রযুক্তি, যা চোখের রেটিনা ও অপটিক নার্ভের রোগ শনাক্তে ব্যবহৃত হয়, সেটিও পুরস্কারের জন্য বিবেচনা করা হতে পারে। রোগ প্রতিরোধব্যবস্থায় ‘অ্যাডহেশন রিসেপ্টর’ নিয়ে গবেষণার জন্য মার্কিন ইমিউনোলজিস্ট টিমোথি স্প্রিঙ্গার এবং স্তন ক্যানসার ও করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সহায়তাকারী ডিএনএ সিকোয়েন্সিং নিয়ে করা গবেষণার নামও সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে।

 চিকিৎসাবিজ্ঞানের পর মঙ্গলবার পদার্থবিজ্ঞান, বুধবার রসায়ন এবং বৃহস্পতিবার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হবে। সাহিত্য সমালোচকদের ধারণা, এবার সাহিত্যে কোনো নারী লেখককে বেছে নেওয়া হতে পারে। সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আর্জেন্টিনার সামান্তা শভেবলিন, অ্যান্টিগুয়া-আমেরিকান জামাইকা কিনকেইড, চীনের কান শুয়ে এবং মেক্সিকোর ক্রিস্টিনা রিভেরা গারসার নাম আলোচনা হচ্ছে।

তবে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ ও জল্পনা-কল্পনা রয়েছে শুক্রবারের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার নিয়ে, যা নরওয়ের অসলো থেকে দেওয়া হয়। গত বছর শান্তিতে নোবেল পেয়েছিলেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো, যা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। নোবেল কমিটির সচিব ক্রিস্টিয়ান বার্গ হার্পভিকেন জানান, পুরস্কারের জন্য সবসময় তদবির থাকে, তবে তারা তা মোকাবিলায় অভ্যস্ত। এবারও নোবেল কমিটির সিদ্ধান্তের দিকে নজর থাকবে গতবার প্রকাশ্যে প্রচারণা চালানো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের।

শান্তিতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’ এবং ইউক্রেনের শিশু অধিকারকর্মী মিকোলা কুলেবাকে যৌথভাবে, সুদানের স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস’ এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা ‘সিপিজে’-র নাম আলোচনা হচ্ছে।

আগামী ১২ অক্টোবর অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের নোবেল পুরস্কারের মহোৎসব।