দূর থেকে দেখলে সবুজের সমুদ্র, আর কাছে গেলেই নজর কাড়ে রঙিন আখের সারি। রসালো স্বাদ আর দৃষ্টিনন্দন রঙে ‘রঙ বিলাস’ এখন শুধু কৃষকের শখের ফসল নয়, হয়ে উঠছে আয়ের নতুন ঠিকানা। নাটোরের চলনবিল অধ্যুষিত গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম ও সিংড়ার মাঠজুড়ে এই আখ চাষে সম্ভাবনার নতুন গল্প লিখছেন কৃষকরা।
আর সেই সম্ভাবনার পরিধিও কিন্তু ছোট নয়। চলতি মৌসুমে নাটোরে ১২৬ হেক্টর জমিতে চিবিয়ে খাওয়ার এই আখের আবাদ হয়েছে। সবচেয়ে বেশি চাষ হয়েছে গুরুদাসপুরে ৬০ হেক্টর, বড়াইগ্রামে ৫২ এবং সিংড়ায় ১৪ হেক্টর। কৃষি বিভাগের হিসাবে, এসব জমি থেকে মিলতে পারে প্রায় এক হাজার ২১৩ টন রস। চলনবিলের মাটি, পানি আর আবহাওয়ার সঙ্গে এই জাতের আখের বেশ ভালো মানিয়ে যাওয়াই চাষে আগ্রহ বাড়াচ্ছে।
তবে ‘রঙ বিলাসের’ আকর্ষণ শুধু ফলনেই নয়, একই জমি থেকে বাড়তি আয়ের সুযোগেও। আখের চারা লাগানোর পর জমির ফাঁকা জায়গায় কৃষকরা করছেন রসুন, পেঁয়াজ কিংবা মুগ ডালের চাষ। ফলে আখ বড় হওয়ার আগেই সাথি ফসল থেকে উঠে আসছে চাষের খরচ। একজন কৃষকের হিসাবে, রসুনে বিঘাপ্রতি ২৫ থেকে ৩০ মণ এবং পেঁয়াজে সর্বোচ্চ ৬০ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া যাচ্ছে। আর সাথি ফসলের সুবিধা কাজে লাগিয়ে বিঘাপ্রতি প্রায় দুই লাখ টাকা পর্যন্ত লাভের সম্ভাবনাও দেখছেন তারা।
সাথি ফসলের পাশাপাশি মূল আখ থেকেও মিলছে মোটা অঙ্কের আয়। বড়াইগ্রামের কৃষক গোলাম রসুল প্রায় তিন দশক ধরে চাষ করছেন ‘রঙ বিলাস’। চলতি বছর পাঁচ বিঘা জমিতে আখ লাগিয়ে এরই মধ্যে দুই বিঘার ফসল বিক্রি করেছেন সাড়ে চার লাখ টাকায়। ক্ষেত থেকেই বাইরের জেলার ব্যবসায়ীরা আখ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। একশ’ আখ বিক্রি হচ্ছে প্রায় তিন থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত, আর খুচরা বাজারে প্রতি পিসের দাম উঠছে ৪০ থেকে ৮০ টাকা।
এমন বাজার আর লাভের হিসাবেই বছর বছর বাড়ছে কৃষকের আগ্রহ। তবে ভালো ফলন পেতে সারাবছরই দিতে হয় জমির যত্ন। বিশেষ করে ছত্রাকের আক্রমণ ঠেকাতে নিয়মিত নজরদারি জরুরি। তাই অভিজ্ঞ কৃষকরা যেমন নিজেরাই পরিচর্যার কৌশল রপ্ত করেছেন, তেমনি কৃষি বিভাগও চাষিদের দিচ্ছে প্রয়োজনীয় পরামর্শ। শুধু রসুন-পেঁয়াজ নয়, মুগ ডালের মতো সাথি ফসল যুক্ত করেও আখ চাষকে আরও লাভজনক করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
আর কৃষকের এই সাফল্যকে ভবিষ্যতের বড় সম্ভাবনা হিসেবেই দেখছে কৃষি বিভাগ। বড়াইগ্রাম ও গুরুদাসপুরে এরই মধ্যে ‘রঙ বিলাস’ আখের আবাদ বিস্তৃত হয়েছে। বিশেষ করে গুরুদাসপুর চলতি মৌসুমে এই আখ চাষে জেলার অন্যতম এগিয়ে থাকা উপজেলা। কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, চাষিদের আগ্রহ ধরে রাখা গেলে আগামী দিনে আবাদ আরও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে চলনবিলের মাঠে ‘রঙ বিলাস’ এখন যেন কৃষির নতুন রঙ। সৌন্দর্যের পাশাপাশি যার প্রতিটি কাণ্ডে লুকিয়ে আছে আয়ের সম্ভাবনা। তাই কৃষকের কাছে এটি আর নিছক একটি আখ নয় - সঠিক পরিচর্যা, সাথি ফসল আর ভালো বাজার নিশ্চিত করতে পারলে ‘রঙ বিলাস’ই হয়ে উঠতে পারে চলনবিলের অন্যতম লাভজনক অর্থকরী ফসল।