স্বামীকে হারিয়ে যখন সংসারের হাল ধরাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, তখন থেমে যাননি নীলফামারীর খাদিজা আক্তার। দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ আর পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে শুরু হয় তার একার লড়াই। সেই লড়াইয়ে কখনো হাতে উঠেছে ব্যবসার খাতা, কখনো কৃষির সরঞ্জাম। আর ধীরে ধীরে পরিশ্রম আর সাহসে নিজের জীবনটাই বদলে দিয়েছেন তিনি। আজ পাঁচ বিঘার বাগানে শোভা পাচ্ছে কফি, রাম্বুটান, কোকো, ড্রাগন ও প্যাশন ফলসহ নানা দেশি-বিদেশি ফল।
তবে এই সবুজ বাগানের গল্পের শুরুটা মোটেও এতটা রঙিন ছিল না। ২০১৪ সালে হৃদরোগসহ নানা জটিলতায় স্বামী নজরুল ইসলাম মারা গেলে দুই সন্তানকে নিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন খাদিজা। একদিকে সংসারের খরচ, অন্যদিকে পড়াশোনা করা দুই ছেলের ভবিষ্যৎ - সব দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। স্বামীর রেখে যাওয়া স্টেশনারি ব্যবসা সামলানোর পাশাপাশি সন্তানদের লেখাপড়াও চালিয়ে যান তিনি। শেষ পর্যন্ত বড় ছেলে এমবিএ এবং ছোট ছেলে কৃষি বিষয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।
সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার পর এবার নিজের স্বপ্নকে ডানা দেওয়ার পালা। ২০১৮ সালে বাড়ির পাশের পতিত জমি পরিষ্কার করে কৃষিতে নতুনভাবে পথচলা শুরু করেন খাদিজা। বড় ছেলের পরামর্শে প্রথমে লাগান অ্যারাবিকা জাতের কফি। ধীরে ধীরে সেই বাগানে যোগ হয় রাম্বুটান, কোকো, ড্রাগন ও প্যাশন ফ্রুটসহ নানা বিদেশি ফল। অনেকের কটু কথা আর নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও নিজের সিদ্ধান্ত থেকে একচুলও সরেননি তিনি।
আর সেই জেদের ফল মিলতেও খুব বেশি সময় লাগেনি। কয়েক বছরের মধ্যেই গাছে ধরতে শুরু করে ফল। প্রায় ছয় বছর ধরে কফি বাজারজাত করছেন খাদিজা। গত বছর প্রায় ৪০০ কেজি রাম্বুটান বিক্রি করেছেন তিনি। চলতি বছর মাত্র তিনটি গাছ থেকেই পেয়েছেন প্রায় ৮০ কেজি ফল। সব মিলিয়ে বাগান থেকে খরচ বাদ দিয়ে বছরে আয় করছেন প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা। কফি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত।
শুধু ফল উৎপাদনেই থেমে থাকেননি এই উদ্যোক্তা। পাঁচ বিঘার বাগানের তিন বিঘায় রয়েছে কফি, আর বাকি অংশে রাম্বুটান, কোকো, ড্রাগন ফল ও প্যাশন ফ্রুটসহ নানা ফলের গাছ। পাশাপাশি রয়েছে রঙিন মাছের পোনা উৎপাদন। আরও আছে নিজস্ব নার্সারি - যেখানে প্রায় ২ হাজার ৫০০টি কফি, ৩০০টি রাম্বুটান এবং ২০০টি কোকোর চারা রয়েছে। অনলাইনের মাধ্যমেও এসব চারা বিক্রি করছেন তিনি।
এই বহুমুখী উদ্যোগের পেছনে রয়েছে পরিবারের সহযোগিতাও। কৃষিবিদ ছোট ছেলে সেফায়েত নামরাত অবসর সময়ে মায়ের সঙ্গে বাগানের পরিচর্যা এবং অনলাইনে ফল ও চারা বিক্রিতে সহযোগিতা করছেন। নিজের আয় থেকে এরই মধ্যে ৭৫ শতাংশ জমিও কিনেছেন খাদিজা। কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে পেয়েছেন একাধিক স্বীকৃতি; চলতি বছর হয়েছেন জেলার সেরা নারী কৃষি উদ্যোক্তা। আর ২০২২ সালে রঙিন মাছের পোনা উৎপাদনের জন্যও পেয়েছেন সম্মাননা।
একসময় স্বামীহারা এই নারী যেখানে দুই সন্তানকে নিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন, আজ তার বাগানই হয়ে উঠেছে স্বপ্ন আর সম্ভাবনার ঠিকানা। খাদিজার হাত ধরে পতিত জমিতে ফলছে বিদেশি ফল, তৈরি হচ্ছে নতুন আয়ের পথ। আর তার এই সাফল্য দেখে গ্রামের অন্যরাও আগ্রহী হচ্ছেন দেশি-বিদেশি ফল চাষে। খাদিজার বার্তাটাও তাই স্পষ্ট - বড় কিছু করার জন্য সবসময় বড় জায়গা লাগে না, প্রয়োজন শুধু সাহস করে শুরু করার। সেই শুরুটাই একদিন বদলে দিতে পারে পুরো জীবন।