পাহাড়ের সবুজ ঢেউয়ের ভাঁজে ভাঁজে এবার জন্ম নিচ্ছে নতুন সম্ভাবনা। আড়াই দশকের গবেষণার পর খাগড়াছড়িতে কফির দুটি নতুন জাত উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট - বারি কফি-১ ও বারি কফি-২। অনাবাদি ও পতিত জমির পাশাপাশি ফলবাগান কিংবা বনজ গাছের ছায়াতেও করা যাবে এই কফির আবাদ। অর্থাৎ পাহাড়ের অব্যবহৃত জমি যেমন আসতে পারে চাষের আওতায়, তেমনি কফি হয়ে উঠতে পারে নতুন অর্থকরী ফসল।

এই সম্ভাবনার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ গবেষণার গল্প। খাগড়াছড়ির পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে কফি নিয়ে গবেষণার সূচনা ২০০১ সালে। বিভিন্ন উৎস থেকে জার্মপ্লাজম সংগ্রহ, বাছাই, অগ্রবর্তী লাইন তৈরি, ফলন ও গুণগত মান যাচাইয়ের পাশাপাশি পাহাড়ি পরিবেশে অভিযোজন পরীক্ষা চালানো হয় বছরের পর বছর। সেই নিরলস গবেষণার ফলেই পাহাড়ের মাটিতে রোবাস্টা ও অ্যারাবিকা - দুই ধরনের কফির উপযোগী জাতের সম্ভাবনা তৈরি হয়।

গবেষণার সেই সাফল্য পরে পেয়েছে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। ২০২৩ সালে অবমুক্ত করা হয় বারি কফি-১, যা রোবাস্টা জাতের। আর ২০২৫ সালে আসে অ্যারাবিকা জাতের বারি কফি-২। তবে গবেষণার ফল শুধু গবেষণাগারেই আটকে থাকেনি; ২০২১ সাল থেকে পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র থেকে প্রায় ১ হাজার ৩০০টি কফির চারা কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। ফলে পাহাড়ের কৃষকের হাতেও পৌঁছেছে নতুন ফসলের সম্ভাবনা।

চারা যখন মাঠে, তখন সম্ভাবনার গল্পটাও আরও বাস্তব হয়ে ওঠে। পূর্ণবয়স্ক একটি কফি গাছ থেকে বছরে প্রায় ৩ থেকে ৪ কেজি কফি বীজ পাওয়ার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে মাঠভিত্তিক প্রতিবেদনে। একইসঙ্গে প্রতি কেজি বীজের সম্ভাব্য দাম ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত পাওয়ার তথ্যও রয়েছে। যদিও জাত, গুণগত মান, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারভেদে দামের তারতম্য হতে পারে। তাই কফির এই হিসাবকে নিশ্চিত আয় নয়, বরং সম্ভাবনার একটি চিত্র হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

আর এই সম্ভাবনা শুধু একটি ফসলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিদ্যমান ফলদ কিংবা বনজ গাছের ছায়াতেও কফি চাষ করা সম্ভব হওয়ায় নতুন করে পুরো জমি পরিষ্কার করার প্রয়োজন নেই। একই জমি থেকে একাধিক ফসলের আয়, পাশাপাশি চারা উৎপাদন, বাগান পরিচর্যা, ফল সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণন - সব মিলিয়ে পাহাড়ে তৈরি হতে পারে নতুন কৃষি অর্থনীতির পরিসর। এমনকি স্থানীয়ভাবে কফি প্রক্রিয়াজাত ও বিক্রির উদ্যোগ বাড়লে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানের নতুন দরজাও খুলতে পারে।

তবে সম্ভাবনার এই পথ মসৃণ নয়। কফিকে বাণিজ্যিক ফসলে রূপ দিতে প্রয়োজন উপযুক্ত জাত ও ক্লোন নির্বাচন, সঠিক ছায়াব্যবস্থা, সার ও পানি ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং সময়মতো ফল সংগ্রহ। আর ফলন পাওয়ার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ - সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণ। কারণ শুধু ভালো কফি ফলালেই হবে না, বাজারে টিকে থাকতে হলে নিশ্চিত করতে হবে মানসম্মত বীজ, ধারাবাহিক গুণগত মান, ভালো প্যাকেজিং ও শক্তিশালী বাজারসংযোগ।

দেশে কফির চাহিদা বাড়লেও বাজারের বড় অংশ এখনো আমদানিনির্ভর। তাই পাহাড়ে উৎপাদন বাড়াতে পারলে একদিকে যেমন আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে মানসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে রপ্তানির দুয়ারও খুলতে পারে। তবে সেই লক্ষ্যে উৎপাদন থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণ, ব্র্যান্ডিং থেকে বাজারজাতকরণ - পুরো ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে হবে সমন্বিতভাবে। আড়াই দশকের গবেষণায় পাহাড়ে যে কফির বীজ বোনা হয়েছে, এখন সেটিকে টেকসই কৃষি অর্থনীতির বৃক্ষে পরিণত করাই বড় চ্যালেঞ্জ।