একসময় চলনবিলের পানিতে ছিল শামুক-ঝিনুকের অফুরন্ত ভান্ডার, আর সেই প্রাকৃতিক সম্পদ ঘিরেই বেঁচে থাকার স্বপ্ন বুনতেন বহু মানুষ। হাঁসের খাবার জোগানো থেকে শুরু করে জলাভূমির প্রাণবৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখা - সবখানেই ছিল শামুকের নীরব অবদান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই শামুকই পরিণত হয়েছে বাণিজ্যিক পণ্যে। নির্বিচারে আহরণ আর লাভের প্রতিযোগিতায় সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোরজুড়ে বিস্তৃত চলনবিলের পরিবেশ এখন পড়েছে গভীর সংকটে।

চলনবিলের এই সংকটের পেছনে রয়েছে শামুকের বাড়তি বাজারমূল্য। একসময় স্থানীয় মানুষ প্রয়োজনমতো শামুক সংগ্রহ করে হাঁসের খাবার হিসেবে ব্যবহার করতেন, এমনকি বর্ষা শেষে পানি কমে গেলে ডোবা-নালায় সংরক্ষণ করতেন বছরের পর বছর হাঁস পালনের জন্য। এতে একদিকে কমত খামারিদের খরচ, অন্যদিকে টিকে থাকত প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান। কিন্তু এখন সেই সীমিত সংগ্রহের জায়গা দখল করেছে দলবদ্ধভাবে বিপুল পরিমাণ শামুক আহরণ, যার চাপ সামলাতে পারছে না জলাভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ।

বিশেষ করে তাড়াশ, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও সিংড়া এলাকায় শামুক কেনাবেচাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বড়সড় বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক। স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, এসব এলাকায় ৫০টিরও বেশি আড়তে শামুক-ঝিনুক কেনাবেচা হচ্ছে। সেখান থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ শামুক ট্রাকে করে পাঠানো হচ্ছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায়। প্রতি বস্তা শামুক আড়তদারেরা কিনছেন ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায়, আর ঘেরমালিকদের কাছে বিক্রি করছেন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায়। লাভের এই হিসাব যত বড় হচ্ছে, ততই ফুরিয়ে আসছে বিলের প্রাকৃতিক সম্পদ।

চলনবিল থেকে সংগৃহীত শামুক-ঝিনুকের বড় অংশ যাচ্ছে বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরার চিংড়ি ও মাছের ঘেরে। সেখানে শামুকের মাংস ব্যবহার করা হচ্ছে মাছ ও চিংড়ির তুলনামূলক সাশ্রয়ী খাবার হিসেবে। আবার খোলস গুঁড়ো করে তৈরি হচ্ছে ফিশমিল, পোলট্রি খাদ্যের উপকরণ ও চুন। অর্থাৎ, জলাভূমির তলদেশ থেকে তুলে আনা শামুক এখন নানা শিল্প ও বাণিজ্যের কাঁচামাল। কিন্তু এই চাহিদা মেটাতে গিয়ে প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদনের সুযোগ কতটা থাকছে, সেই প্রশ্নই বড় হয়ে উঠছে।

তবে এই ব্যবসার পেছনে রয়েছে জীবিকার কঠিন বাস্তবতাও। বর্ষাকালে অন্য কাজের সুযোগ কমে গেলে চলনবিলের অনেক দরিদ্র পরিবারের কাছে শামুক সংগ্রহ হয়ে ওঠে উপার্জনের ভরসা। তাড়াশের ডাহিয়া গ্রামের কামাল মিয়া প্রতিদিন দুই বস্তা শামুক তুলে আয় করেন প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা। একই এলাকার আসমা বেগম এক বস্তা শামুক সংগ্রহ করে পান ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, যা দিয়ে চলে সংসার। আবার কিশোর সাইদুল শামুক বিক্রির আয় দিয়ে জোগাচ্ছে পড়াশোনার খরচ। ফলে শামুক আহরণ বন্ধের প্রশ্নে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থাও জরুরি হয়ে উঠেছে।

কিন্তু মানুষের এই সাময়িক আয়ের আড়ালে প্রকৃতি হারাচ্ছে তার দীর্ঘদিনের সহচরদের। শামুকখোলসহ নানা পাখির খাদ্য জোগানে শামুক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, আর জলাভূমির খাদ্যশৃঙ্খলেও এদের রয়েছে অপরিহার্য অবস্থান। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক নজরুল ইসলামের মতে, চলনবিলে ‘অ্যাপেল স্নেল’ বা আপেল শামুকের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। শামুক পচে মাটিতে মিশে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও পটাশের মতো উপাদান ফিরিয়ে দেয় প্রকৃতিতে, যা মাটির উর্বরতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। তাই নির্বিচারে শামুক নিধন শুধু পাখি ও জলজ প্রাণীর খাদ্যসংকটই বাড়ায় না, দীর্ঘমেয়াদে কৃষি ও পরিবেশের ভারসাম্যও বিপন্ন করতে পারে।

চলনবিলের ১৬টি নদী, ৩৯টি বিল ও ২২টি খাঁড়িতে বছরের দীর্ঘ সময় ধরে চলে শামুক সংগ্রহ, যার তীব্রতা সবচেয়ে বেশি বর্ষা থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত। এই আহরণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি, জনসচেতনতা এবং দরিদ্র সংগ্রহকারীদের বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। কারণ প্রকৃতির ভান্ডার একবার শূন্য হয়ে গেলে তা ফিরিয়ে আনা সহজ নয়। আজ শামুক বিক্রি করে যে পরিবারগুলো বেঁচে আছে, আগামী দিনে তাদেরই জীবিকা হুমকিতে পড়তে পারে যদি বিলের প্রাণ-প্রকৃতি নিঃশেষ হয়ে যায়। তাই চলনবিলকে বাঁচাতে এখনই প্রয়োজন জীবিকা ও জীববৈচিত্র্যের মধ্যে ভারসাম্য গড়ে তোলা।