সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মদিনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ বিতরণকেন্দ্রে সাম্প্রতিক এক হামলার ঘটনায় ইয়েমেনের সশস্ত্র শিয়া বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতিদের সরাসরি দায়ী করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। তবে এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ 'মিথ্যা' ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে তা একবাক্যে প্রত্যাখ্যান করেছে হুতি গোষ্ঠী।
সৌদি জোটের ভাষ্যমতে, গত মঙ্গলবার মদিনার ওই বিদ্যুৎ বিতরণকেন্দ্রে হামলা চালানো হয়। উল্লেখ্য, এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি থেকেই বিখ্যাত মসজিদে নববীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়ে থাকে। হামলার ফলে একটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার সাময়িকভাবে অচল হয়ে গেলেও মূল বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় ঘটেনি।
জোটের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, হামলার পরপরই চালানো প্রাথমিক তদন্ত এবং ঘটনাস্থলে উদ্ধারকৃত ক্ষয়ক্ষতি হওয়া ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এতে হুতিদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতার স্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।
হুতিদের অস্বীকার ও পাল্টা অভিযোগ অন্যদিকে, হুতি-নিয়ন্ত্রিত সাবা নিউজ এজেন্সিতে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে গোষ্ঠীটির সামরিক বাহিনীর এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সৌদি জোটের দেওয়া এই অভিযোগ ভিত্তিহীন ও ‘মিথ্যা’ বলে দাবি করেন।
তিনি পাল্টা অভিযোগ তোলেন যে, ইতিপূর্বে মক্কায় হুতিরা হামলা চালিয়েছে বলে সৌদি আরব যে মিথ্যা দাবি করেছিল, পরবর্তীতে তার সপক্ষে প্রমাণ দিতে চরম ব্যর্থ হয়েছে। সেই ব্যর্থতা ও ঘটনাকে ঢাকার জন্যই নতুন করে মদিনার ওপর হামলার অবাস্তব গল্প ফাঁদা হচ্ছে।
সৌদি জোট অবশ্য জোর দিয়ে বলেছে, মদিনার বিদ্যুৎকেন্দ্রে এই আঘাত হানা মূলত মক্কার মসজিদুল হারাম ও মদিনার মসজিদে নববী—এই দুই পরম পবিত্র স্থাপনাকে নিশানা বানাতে হুতিদের ধারাবাহিক চক্রান্তেরই অংশ। গোটা মুসলিম বিশ্বের ভাবাবেগ ও উত্তেজনার পারদ বাড়িয়ে তোলাই এর মূল উদ্দেশ্য। তবে পবিত্র স্থান ও আগত লাখো মুসল্লির নিরাপত্তা রক্ষায় সৌদি জোট সর্বোচ্চ কঠোর পদক্ষেপ অব্যাহত রাখবে বলে ঘোষণা দিয়েছে।
ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নস্যাৎ এদিকে বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতে হুতিদের উদ্দেশ্য করে ছোড়া চারটি বিধ্বংসী ড্রোন সফলভাবে আকাশেই ধ্বংস করার দাবি করেছে সৌদি জোট। একই দিনে খামিস মুশাইত ও জাজান লক্ষ্য করে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও আকাশে থাকতেই আছড়ে ফেলার তথ্য নিশ্চিত করেছে বাহিনীটি।
ইয়েমেনের তাইজ প্রদেশে ভয়াবহ লড়াই মদিনায় হামলার উত্তপ্ত অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যেই ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইজ প্রদেশে হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে দেশটির সরকারি বাহিনীর তীব্র রক্তক্ষয়ী মুখোমুখি সংঘর্ষ চলছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, হুতিদের একটি বড় ধরনের সশস্ত্র হামলা প্রতিহত করে তাদের অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতি সাধন করা হয়েছে।
ইয়েমেন সেনাসূত্র জানায়, বুধবার সন্ধ্যা থেকে তাইজের পশ্চিমাঞ্চলের জাবাল হাবাশি, মাকবানাহ এবং দক্ষিণ-পূর্বের আল-আকরুদ এলাকায় হুতিরা ভারী গোলাবর্ষণ শুরু করে। সরকারি বাহিনীর প্রবল প্রতিরোধে শুধু আল-আকরুদ এলাকাতেই অন্তত ৩০ জন হুতি যোদ্ধা নিহত এবং বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছে। এ ছাড়া তাইজের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও মাকবানাহ এলাকার হুমাইর ফ্রন্টে চালানো ছয়টি পৃথক বিমান হামলায় হুতিদের ব্যাপক সামরিক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে।
সংঘাত তীব্র রূপ নেওয়ায় ইয়েমেনে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত সাধারণ মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে। বাস্তুচ্যুতদের একটি বিশাল অংশ তাইজ প্রদেশে আশ্রয় নিয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ১ লাখ ৯৭ হাজার ৯০৬ জন বাস্তুচ্যুত মানুষ নিবন্ধিত হয়েছে। এর মধ্যে এককভাবে তাইজ প্রদেশেই আশ্রয় নিয়েছে ৯৭ হাজারের বেশি মানুষ। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫০ হাজারের বেশি আশ্রয়হীন মানুষ অবস্থান করছে লাহিজ প্রদেশে।
ইয়েমেন সরকারকে ৬০ কোটি ডলার সহায়তা সৌদির তাইজের রণক্ষেত্রে তীব্র লড়াইয়ের মধ্যেই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সহায়তা দিতে ২২ কোটি ৪০ লাখ সৌদি রিয়াল (প্রায় ৫৯ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার) সরাসরি বাজেট সহায়তা দেওয়ার সরকারি অনুমোদন দিয়েছে সৌদি আরব।
সৌদি আরবে নিযুক্ত ইয়েমেনের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ আল-জাবির নিশ্চিত করেছেন যে, ইয়েমেন সরকারের অভ্যন্তরীণ অর্থপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা, আর্থিক নীতির কার্যকারিতা বাড়ানো এবং দেশটির চরম মন্দাক্রান্ত নাগরিকদের নিত্যপণ্য ক্রয়ের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে এই অর্থ সরাসরি ব্যবহার করা হবে।
বাব আল-মান্দাব ও মোখা বন্দর রক্ষায় জোর তৎপরতা এর আগে গত মাসে কৌশলগত দিক থেকে অতীব গুরুত্বপূর্ণ 'বাব আল-মান্দাব' প্রণালির কাছে অবস্থিত লোহিত সাগরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোখা শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করে হুতিরা। এটি সুয়েজ খাল হয়ে ভূমধ্যসাগরে জ্বালানি ও তেল পরিবহনের পাশাপাশি এশিয়া ও রাশিয়ার বাণিজ্য চলাচলের মূল আন্তর্জাতিক নৌপথ।
মোখা শহর থেকে হুতিদের আর একধাপও এগোতে না দেওয়ার শপথ নিয়েছে ইয়েমেনের সরকারি সামরিক বাহিনী। তাইজ ও পশ্চিম উপকূলের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা মোখা শহরটি দ্রুত হুতিদের দখলমুক্ত করার জন্য সাঁড়াশি অভিযানের পরিকল্পনা নিশ্চিত করেছেন।