সাদা পোশাকে বিশ্বকে শাসিয়ে বেড়াচ্ছেন বাংলাদেশ দলের পেসাররা। তবে যে বাংলাদেশ একসময় বিশ্বব্যাপী পরিচিত ছিল স্পিননির্ভর দল হিসেবে, যেখানে গড়ে উঠেছিলেন আব্দুর রাজ্জাক, সাকিব আল হাসানের মতো বিশ্বখ্যাত স্পিনার, সেখানে হঠাৎ এমন পরিবর্তনের কারণটাই বা কী? কী এমন জাদুতে বদলে গেল বাংলাদেশের পেস বোলিং ইউনিটের চিত্র? যে মিরপুর একসময় বিশ্বব্যাপী পরিচিত ছিল ধানক্ষেত নামে, আজ সেই মাঠেই আগুন ঝরাতে দেখা যাচ্ছে নাহিদ রানা, শরিফুল ইসলাম কিংবা মোস্তাফিজুর রহমানকে। ক্রিকেটে পেসারদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র কাটার আর সুইং ডেলিভারি। তবে এর বাইরেও রয়েছে আরেকটি কার্যকর কৌশল, আর তা হলো ওবল সিম। পেসারদের হাতের কৌশলে মূলত ব্যাটারদের ফাঁদে ফেলতেই ব্যবহৃত হয় এই ডেলিভারি। কাটার হলো এমন একটি কৌশল, যা বোলারের বল ছোড়ার আগে হাতের গ্রিপের ওপর নির্ভর করে। বলটি উইকেটে পড়ার পর স্টাম্প বরাবর ভেতরের দিকে যাবে, নাকি ব্যাটারের পাশ ঘেঁষে উইকেটকিপারের কাছে চলে যাবে, তা নির্ভর করে বোলারের গ্রিপ ও রিলিজের ওপর। আর সুইং হলো এমন এক কৌশল, যা অনেকটাই নির্ভর করে বাতাসের ওপর। পিচের ওপরের বাতাসকে কাজে লাগিয়ে বোলাররা বল শূন্যে ভাসমান থাকা অবস্থাতেই সেটিকে ডানে কিংবা বাঁয়ে নিয়ে যেতে পারেন। ফলে খুব সহজেই বিভ্রান্ত করা যায় ব্যাটারকে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, ওবল সিম কী এবং এর কাজটাই বা কী?

ওবল সিমকে অনেকটা কাটার আর সুইং বোলিংয়ের মিশ্র রূপ বলা যায়। লেগ কাটার কিংবা অফ কাটার করার জন্য বোলাররা বলের গ্রিপ একটি বিশেষ কৌশলে আঁকড়ে ধরেন, যা ব্যাটারের পক্ষে অনেক সময় বুঝে ফেলা সম্ভব। তবে ওবল সিমের ক্ষেত্রে পেসাররা বলটিকে সামান্য বাঁকিয়ে ধরেন। সেই সঙ্গে ব্যবহার করেন পিচের ওপরের বাতাসকেও। ফলে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা ব্যাটারকে বিভ্রান্ত করে ফেলে। বল বাতাসে দুলতে দুলতে উইকেটে পড়ে, এরপর কখনো উইকেটের দিকে ঢুকে যায়, আবার কখনো উইকেট থেকে বেরিয়ে অনেকটা দূরে চলে যায়। ফলে ব্যাটার বলের মুভমেন্ট বুঝে ওঠার আগেই সেটি সরাসরি স্টাম্পে আঘাত করতে পারে, কিংবা ব্যাটারের ব্যাটের কিনারা ছুঁয়ে ক্যাচ উঠে যেতে পারে উইকেটকিপারের হাতে।বিশ্ব ক্রিকেটে ওবল সিমের ব্যবহার নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি পেসার শন পোলক। ক্রিকেট গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালে ভারতের বিপক্ষে বীরেন্দর শেবাগকে আউট করার সময় এই ধরনের ডেলিভারি ব্যবহার করেছিলেন পোলক। এটিকেই ওবল সিমের প্রথম নথিভুক্ত ব্যবহারের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়। শন পোলক নিজেই জানিয়েছেন, তাঁর রিলিজের ত্রুটির কারণে বল স্বাভাবিকভাবেই এমনভাবে বেরিয়ে আসত। পরে সেই স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যকেই তিনি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন। বাংলাদেশি পেসারদের মধ্যেও এই ডেলিভারির ব্যবহার দেখা গেছে মোস্তাফিজুর রহমানের বোলিংয়ে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ওবল সিমকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করে আলোচনায় এসেছেন হাসান মাহমুদ।

বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ে এই পরিবর্তন তাই শুধু পেসার বাড়ার গল্প নয়, বরং বোলিংয়ের কৌশলগত উন্নতিরও প্রতিচ্ছবি। একসময় যেখানে বাংলাদেশের শক্তির জায়গা ছিল স্পিন, সেখানে এখন নতুন বল থেকে শুরু করে পুরোনো বলেও প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের চাপে রাখছেন পেসাররা। আর ওবল সিমের মতো আধুনিক কৌশলকে কাজে লাগিয়ে সেই আক্রমণ আরও ধারালো হচ্ছে। টেস্ট ক্রিকেটে দুই দিনে ম্যাচ শেষ হয়ে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে আলোচনা চলছে, তখন বাংলাদেশের পেসাররা দেখাচ্ছেন ভিন্ন এক চিত্র। মিরপুরের সেই ‘ধানক্ষেত’এখন আর শুধু স্পিনারদের রাজ্য নয়, পেসারদের আগুনঝরা বোলিংয়ে সাদা পোশাকের ক্রিকেটেও বাংলাদেশ তৈরি করছে নতুন পরিচয়।