বিশ্ব মানবতা, আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থায়িত্ব প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের বৈশ্বিক যেকোনো উদ্যোগের প্রতি বাংলাদেশের সুদৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “বাংলাদেশ এমন একটি সমঝোতামূলক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ বিশ্ব সমাজ প্রতিষ্ঠা দেখতে চায়, যা গড়ে উঠবে একে অপরের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীলতার ভিত্তিপ্রস্তরকে কেন্দ্র করে— আর এই প্রক্রিয়ার প্রধান মূলবিন্দু হতে হবে জাতিসংঘকে।”
বৃহস্পতিবার নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রদত্ত তাঁর বিশেষ ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব দূরদর্শী অভিমত তুলে ধরেন।
ভাষণের শুরুতেই বিশ্বমঞ্চে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় ড. খলিলুর রহমানকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর সার্বিক দায়িত্ব পালনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতার দৃঢ় আশ্বাস দেন। একই সাথে তিনি বিদায়ী সভাপতি ম্যাডাম এনালেনা বেয়ারবকের অবদান স্মরণ করে তাঁকে বিশেষ ধন্যবাদ জানান।
বিশ্বের একাধিক দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের মূল ভিত্তি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “বিবদমান ও বিভিন্ন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমতা, ন্যায্যতা, স্ব-স্ব স্বার্থরক্ষা এবং একে অপরের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষাই হওয়া উচিত আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি।”
ভবিষ্যৎ বিশ্ব ব্যবস্থার মানবিক রূপরেখা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ একটি পরম শান্তিময় ও মানবিক বিশ্ব সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রগাঢ় প্রত্যাশা করে, যেখানে কোনো মারণাস্ত্রের শক্তির বদলে যুক্তি-তর্ক, কূটনৈতিক আলোচনা, শিক্ষা ও চেতনাবোধই হবে বৈশ্বিক পরিবর্তনের মূল কার্যকর হাতিয়ার।”
বিশ্বজুড়ে চলমান সামরিক সংঘাত এবং এর আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কুফল প্রসঙ্গে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আজকের এই বিশ্বায়নের চরম যুগে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তেই হোক না কেন— একটি ঘটনা ঘটলে পুরো বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রেই তার কম-বেশি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মূলত মানবসৃষ্ট অহেতুক সংঘাতের কারণেই আজ বিশ্বের বহু দেশে গভীর অশান্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে এবং বিপুলসংখ্যক নিরীহ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে অবর্ণনীয় মানবিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘাতের কারণে বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিও তীব্র ও অভূতপূর্ব চাপের মুখে পড়েছে। তীব্র জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে মারাত্মক বিঘ্ন এবং বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির কারণে সামগ্রিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বিপজ্জনক অবনতি ঘটছে।”
এমন বাস্তবতায় যেকোনো আন্তর্জাতিক বা অভ্যন্তরীণ সংঘাতের স্থায়ী সমাধান কেবল আলোচনা, সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া সম্ভব বলে তিনি মত ব্যক্ত করেন।
সামরিক ব্যয়ের বিস্তার নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, “বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নয়ন মূলক খাতের বাজেট কমিয়ে তা সামরিক ও অস্ত্র খাতে সরিয়ে নেয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা সরাসরি বিশ্বশান্তির প্রধান অন্তরায়। বাংলাদেশ একটি শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং বৈশ্বিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যের প্রতি সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
ফিলিস্তিন সংকট প্রসঙ্গে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি জনগণের দীর্ঘদিনের অবর্ণনীয় দুর্দশা ও নিপীড়ন নিয়ে বাংলাদেশের আপামর গণতন্ত্রকামী জনগণের মনে গভীর শঙ্কা ও উদ্বেগ রয়েছে। তাঁদের মৌলিক আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারসহ ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর প্রতিটি ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশ আবারও তার অবিচল ও নীতিগত সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছে।”
বক্তব্যের একদম শেষ অংশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্তর্জাতিক ও বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের সর্বজনীন সকল নীতি ও মূল মানদণ্ডের প্রতি বাংলাদেশের অকুণ্ঠ ও দৃঢ় সমর্থন পুনরায় ব্যক্ত করেন।