‘ব্রেকিং ব্যাড’ দেখেছেন, আরেক দল দেখেননি—প্রিয় সিনেমা-সিরিজের প্রসঙ্গে এমন বিভাজন প্রায়ই শোনা যায়। তবে ২০০৮ সালে শুরু হয়ে ২০১৩ সালে শেষ হওয়া সিরিজটি এক যুগ পেরিয়েও দর্শক-আলোচনায় সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এবার একুশ শতকের সেরা ১০০ টেলিভিশন সিরিজের তালিকায় শীর্ষস্থান দিয়ে সেই প্রভাবকেই যেন স্বীকৃতি দিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস।
নিউইয়র্ক টাইমসের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ডেভিড সাইমনের ‘দ্য ওয়্যার’, তৃতীয় ম্যাথিউ ওয়াইনারের ‘ম্যাড মেন’ এবং চতুর্থ ‘সাকসেশন’। শীর্ষ পাঁচে আছে ‘ফ্লিব্যাগ’। এরপর ‘গেম অব থ্রোনস’, ‘ভিপ’, ‘৩০ রক’, ‘কার্ব ইয়োর এনথুজিয়াজম’ ও ‘আটলান্টা’।
গত ২৫ বছরে টেলিভিশন ও স্ট্রিমিংয়ের দ্রুত পরিবর্তনের চিত্রও উঠে এসেছে এই তালিকায়। একসময় নির্দিষ্ট সময়ে টেলিভিশনের সামনে বসে অনুষ্ঠান দেখাই ছিল নিয়ম। এরপর কেবল টেলিভিশন, আর এখন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ও ভাষার সিরিজ হাতের নাগালে। নিউইয়র্ক টাইমসের তালিকায় সেই বৈচিত্র্যের প্রতিফলনও রয়েছে।
কীভাবে তৈরি হলো তালিকা
তালিকাটি তৈরিতে নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য ও বিশ্লেষণভিত্তিক বিভাগ ‘দ্য আপশট’ কাজ করেছে। টেলিভিশন অঙ্গনের ৫১৬ জন পেশাজীবীর কাছ থেকে ভোট নেওয়া হয়। প্রত্যেকে একুশ শতকের সর্বোচ্চ ১০টি পছন্দের সিরিজের নাম দিতে পারেন।
যোগ্যতার ক্ষেত্রে শর্ত ছিল—সিরিজটির প্রথম পর্ব ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি বা তার পরে প্রচারিত হতে হবে। দেশ বা ভাষার ক্ষেত্রে কোনো সীমাবদ্ধতা রাখা হয়নি। ড্রামা, কমেডি, তথ্যচিত্র, রিয়েলিটি শো, টক শো, গেম শো এমনকি ইউটিউব সিরিজও বিবেচনায় ছিল। তবে সিরিজে একাধিক পর্ব থাকা বাধ্যতামূলক ছিল।
চূড়ান্ত তালিকা শুধু ভোটের সংখ্যার ভিত্তিতে তৈরি হয়নি। অংশগ্রহণকারীদের এলোমেলোভাবে নির্বাচিত দুটি সিরিজের মধ্যে কোনটিকে বেশি পছন্দ করেন, সেটিও জানাতে বলা হয়। ব্যালটের তথ্য ও এসব মুখোমুখি তুলনার ফল একত্র করে তৈরি করা হয়েছে চূড়ান্ত তালিকা।
কেন শীর্ষে ‘ব্রেকিং ব্যাড’
ভিন্স গিলিগানের ‘ব্রেকিং ব্যাড’-এর গল্প রসায়নের শিক্ষক ওয়াল্টার হোয়াইটকে ঘিরে। ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর পরিবারের আর্থিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে মাদক তৈরির জগতে প্রবেশ করেন তিনি। কিন্তু পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেতে থাকেন ওয়াল্টারও।
ব্রায়ান ক্র্যানস্টনের অভিনয়ে ওয়াল্টার হোয়াইট শুরুতে একজন সাধারণ, অসুস্থ ও পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন মানুষ। পরে তাঁর সেই পরিচয় বদলে যায় ‘হাইজেনবার্গ’ নামে। অর্থ ও পরিবারের নিরাপত্তার জন্য শুরু করা যাত্রা ধীরে ধীরে তাঁকে ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধের আরও গভীরে নিয়ে যায়। তাঁর সাবেক ছাত্র জেসি পিংকম্যানের চরিত্রে অভিনয় করেছেন অ্যারন পল।
সিরিজটির অন্যতম শক্তি ছিল ধীরে ধীরে চরিত্রের পরিবর্তন দেখানো। দর্শককে সবকিছু সরাসরি বলে দেওয়ার বদলে গল্পের নানা স্তর উন্মোচনের সুযোগ রেখেছেন নির্মাতা। ফলে ওয়াল্টারের প্রতি দর্শকের সহানুভূতি একসময় অস্বস্তিতে পরিণত হয়।
‘ব্রেকিং ব্যাড’-এর প্রভাব সিরিজটির সমাপ্তির পরও অব্যাহত থাকে। এর জনপ্রিয় চরিত্র সল গুডম্যানকে কেন্দ্র করে নির্মিত ‘বেটার কল সল’ও নিউইয়র্ক টাইমসের তালিকায় ২৭ নম্বরে জায়গা পেয়েছে।
ভাষার বৈচিত্র্য
তালিকায় শুধু ইংরেজি ভাষার সিরিজই প্রাধান্য পায়নি। কোরিয়ান সিরিজ ‘স্কুইড গেম’ রয়েছে ৭২ নম্বরে। ফরাসি সিরিজ ‘দ্য ব্যুরো’ ৫৪, জাপানি সিরিজ ‘শোগান’ ৮৬ এবং ‘নরমাল পিপল’ রয়েছে ৪৯ নম্বরে।
সাম্প্রতিক সিরিজগুলোর উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য। ২০২৫ সালে শুরু হওয়া ‘দ্য পিট’ রয়েছে ৩৬ নম্বরে এবং ‘অ্যাডোলেসেন্স’ ৪০ নম্বরে। ২০২৪ সালের ‘বেবি রেইনডিয়ার’ জায়গা পেয়েছে ৮৯ নম্বরে।
শীর্ষ পাঁচের অন্য সিরিজগুলো
দ্বিতীয় স্থানে থাকা ‘দ্য ওয়্যার’ বাল্টিমোর শহরের অপরাধ, মাদক ব্যবসা, পুলিশ, রাজনীতি, শিক্ষা ও সংবাদমাধ্যমের জটিল বাস্তবতা তুলে ধরেছে। তৃতীয় ‘ম্যাড মেন’-এর গল্প ষাটের দশকের নিউইয়র্কের বিজ্ঞাপনজগৎকে ঘিরে হলেও এর ভেতর দিয়ে উঠে এসেছে পরিবার, পরিচয়, কর্মক্ষেত্র, পুরুষতন্ত্র ও সামাজিক পরিবর্তনের নানা দিক।
চতুর্থ ‘সাকসেশন’-এর কেন্দ্রে রয়েছে ধনী পরিবারের উত্তরাধিকার ও ক্ষমতার লড়াই। মিডিয়া সাম্রাজ্যের মালিক লোগান রয় ও তাঁর সন্তানদের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে সিরিজটির গল্প।
পঞ্চম স্থানে থাকা ‘ফ্লিব্যাগ’ নির্মাতা ও অভিনেত্রী ফিবি ওয়ালার-ব্রিজের তৈরি ব্রিটিশ কমেডি সিরিজ। মাত্র দুই মৌসুমের এই সিরিজে হাস্যরসের পাশাপাশি শোক, একাকিত্ব, সম্পর্ক ও অপরাধবোধের মতো বিষয় উঠে এসেছে। দর্শকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের অভিনব কৌশলও সিরিজটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে ‘গেম অব থ্রোনস’। জর্জ আর আর মার্টিনের ‘আ সং অব আইস অ্যান্ড ফায়ার’ অবলম্বনে তৈরি সিরিজটি ক্ষমতার লড়াই, রাজনীতি, যুদ্ধ, ষড়যন্ত্র ও ফ্যান্টাসির মিশেলে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
শীর্ষ দশে ড্রামা ও কমেডির বৈচিত্র্যও দেখা যায়। ‘ব্রেকিং ব্যাড’, ‘দ্য ওয়্যার’, ‘ম্যাড মেন’, ‘সাকসেশন’ ও ‘গেম অব থ্রোনস’-এর পাশাপাশি রয়েছে ‘ফ্লিব্যাগ’, ‘ভিপ’, ‘৩০ রক’, ‘কার্ব ইয়োর এনথুজিয়াজম’ ও ‘আটলান্টা’।
কোন দশকের কত সিরিজ
তালিকার ৩২টি সিরিজ প্রথম প্রচারিত হয়েছে ২০০০ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে। ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের সিরিজ রয়েছে ৪৫টি। আর ২০২০ সালের পর শুরু হওয়া সিরিজের সংখ্যা ২৩টি। অর্থাৎ তালিকায় গত এক দশকের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ের বেশ কিছু সিরিজও জায়গা করে নিয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের সেরা ১০০ সিরিজ
১. ‘ব্রেকিং ব্যাড’
২. ‘দ্য ওয়্যার’
৩. ‘ম্যাড মেন’
৪. ‘সাকসেশন’
৫. ‘ফ্লিব্যাগ’
৬. ‘গেম অব থ্রোনস’
৭. ‘ভিপ’
৮. ‘৩০ রক’
৯. ‘কার্ব ইয়োর এনথুজিয়াজম’
১০. ‘আটলান্টা’
১১. ‘দ্য অফিস’ (যুক্তরাষ্ট্র)
১২. ‘অ্যারেস্টেড ডেভেলপমেন্ট’
১৩. ‘গার্লস’
১৪. ‘ফ্রাইডে নাইট লাইটস’
১৫. ‘সিক্স ফিট আন্ডার’
১৬. ‘দ্য অফিস’ (যুক্তরাজ্য)
১৭. ‘দ্য আমেরিকানস’
১৮. ‘আই মে ডেস্ট্রয় ইউ’
১৯. ‘চেরনোবিল’
২০. ‘দ্য ক্রাউন’
২১. ‘দ্য হোয়াইট লোটাস’
২২. ‘লস্ট’
২৩. ‘দ্য কামব্যাক’
২৪. ‘ডেডউড’
২৫. ‘দ্য লেফটওভারস’
২৬. ‘ব্ল্যাক মিরর’
২৭. ‘বেটার কল সল’
২৮. ‘ব্যান্ড অব ব্রাদার্স’
২৯. ‘কি অ্যান্ড পিল’
৩০. ‘সেভারেন্স’
৩১. ‘সারভাইভার’
৩২. ‘অ্যান্ডর’
৩৩. ‘এনলাইটেন্ড’
৩৪. ‘শিটস ক্রিক’
৩৫. ‘ট্রু ডিটেকটিভ’ (প্রথম মৌসুম)
৩৬. ‘দ্য পিট’
৩৭. ‘ব্যাটলস্টার গ্যালাকটিকা’
৩৮. ‘হোমল্যান্ড’
৩৯. ‘ওয়াচমেন’
৪০. ‘অ্যাডোলেসেন্স’
৪১. ‘লুই’
৪২. ‘হ্যাকস’
৪৩. ‘পিকি ব্লাইন্ডার্স’
৪৪. ‘বোজ্যাক হর্সম্যান’
৪৫. ‘হ্যাপি ভ্যালি’
৪৬. ‘ব্রড সিটি’
৪৭. ‘টুইন পিকস: দ্য রিটার্ন’
৪৮. ‘হাউস অব কার্ডস’
৪৯. ‘নরমাল পিপল’
৫০. ‘পার্কস অ্যান্ড রিক্রিয়েশন’
৫১. ‘দ্য গুড প্লেস’
৫২. ‘ডাউনটন অ্যাবি’
৫৩. ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’
৫৪. ‘দ্য ব্যুরো’
৫৫. ‘ইনসিকিউর’
৫৬. ‘নাথান ফর ইউ’
৫৭. ‘আই থিংক ইউ শুড লিভ’
৫৮. ‘শ্যাপেলস শো’
৫৯. ‘পেন১৫’
৬০. ‘পিপ শো’
৬১. ‘রুপলস ড্র্যাগ রেস’
৬২. ‘স্লো হর্সেস’
৬৩. ‘দ্য থিক অব ইট’
৬৪. ‘অ্যান্থনি বোর্দেইন: পার্টস আননোন’
৬৫. ‘মেয়ার অব ইস্টটাউন’
৬৬. ‘দ্য রিহার্সাল’
৬৭. ‘দ্য হ্যান্ডমেইডস টেল’
৬৮. ‘ওজার্ক’
৬৯. ‘অ্যান্থনি বোর্দেইন: নো রিজারভেশনস’
৭০. ‘দ্য শিল্ড’
৭১. ‘বিফ’ (প্রথম মৌসুম)
৭২. ‘স্কুইড গেম’
৭৩. ‘ব্যারি’
৭৪. ‘দ্য বিয়ার’
৭৫. ‘টেড ল্যাসো’
৭৬. ‘সামবডি সামহয়ার’
৭৭. ‘মডার্ন ফ্যামিলি’
৭৮. ‘ইটস অলওয়েজ সানি ইন ফিলাডেলফিয়া’
৭৯. ‘দ্য গুড ওয়াইফ’
৮০. ‘হাউ টু উইথ জন উইলসন’
৮১. ‘দ্য কুইন্স গ্যামবিট’
৮২. ‘বেটার থিংস’
৮৩. ‘জাস্টিফায়েড’
৮৪. ‘প্ল্যানেট আর্থ’
৮৫. ‘দ্য গ্রেট ব্রিটিশ বেক অফ’
৮৬. ‘শোগান’
৮৭. ‘রিজারভেশন ডগস’
৮৮. ‘ডেক্সটার’
৮৯. ‘বেবি রেইনডিয়ার’
৯০. ‘ইস্টবাউন্ড অ্যান্ড ডাউন’
৯১. ‘ক্যাটাস্ট্রফি’
৯২. ‘দ্য নাইট অব’
৯৩. ‘স্টেশন ইলেভেন’
৯৪. ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’
৯৫. ‘হাউস’
৯৬. ‘হল্ট অ্যান্ড ক্যাচ ফায়ার’
৯৭. ‘কমিউনিটি’
৯৮. ‘দ্য ওএ’
৯৯. ‘গিলমোর গার্লস’
১০০. ‘স্ক্যান্ডাল’