শহরে নিজের একটি স্থায়ী ঠিকানা—অনেকেরই দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। তবে বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্ত শুধু পছন্দের লোকেশন, নকশা কিংবা আকারের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনাও। কত দামের বাড়ি কেনা সামর্থ্যের মধ্যে, কত টাকা ডাউন পেমেন্ট দেওয়া সম্ভব, মাসিক কিস্তি কত হলে স্বস্তিতে পরিশোধ করা যাবে এবং ব্যাংক কত টাকা ঋণ দিতে পারে—এসব বিষয় আগে থেকেই হিসাব করে নেওয়া জরুরি।
এর বাইরে বাড়ি বা ফ্ল্যাটের মূল দামের সঙ্গে যুক্ত হয় নিবন্ধন, স্ট্যাম্প ডিউটি, আইনি ও ডকুমেন্টেশন ব্যয়, ঋণ প্রক্রিয়াকরণ ফি, সম্পত্তি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন হলে সংস্কার বা ইন্টেরিয়রের খরচ। তাই শুধু ফ্ল্যাটের দাম হিসাব করলেই হবে না, আনুষঙ্গিক খরচের জন্যও আলাদা প্রস্তুতি থাকা দরকার।
ইএমআইয়ের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ
হোম লোন নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো ইএমআই বা মাসিক কিস্তি। ঋণের পরিমাণ, সুদের হার, ঋণের মেয়াদ এবং পরিশোধের ধরন—এসবের ওপর নির্ভর করে কিস্তির পরিমাণ নির্ধারিত হয়।
ঋণের মেয়াদ বাড়ালে সাধারণত মাসিক কিস্তির চাপ কমে। তবে এতে দীর্ঘ সময়ে মোট সুদের ব্যয় বাড়তে পারে। আবার মেয়াদ কম হলে মাসিক কিস্তি বেশি হলেও মোট সুদের পরিমাণ তুলনামূলক কম হতে পারে। তাই শুধু মাসে কত টাকা দিতে হবে, সেটি না দেখে পুরো ঋণের মেয়াদে মোট কত টাকা পরিশোধ করতে হবে, সেটিও বিবেচনায় রাখা উচিত।
কত টাকা ঋণ পাওয়া যাবে
শুধু মাসিক আয় বেশি হলেই বড় অঙ্কের হোম লোন পাওয়া যায়—বিষয়টি এমন নয়। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণ দেওয়ার আগে আবেদনকারীর সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করে।
এ ক্ষেত্রে মাসিক ও বার্ষিক আয়, চাকরি বা ব্যবসার স্থায়িত্ব, বিদ্যমান ঋণের দায়, ব্যাংক লেনদেনের ইতিহাস, ক্রেডিট রেকর্ড, বয়স এবং প্রয়োজন হলে সহ-আবেদনকারীর আয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে গ্রাহকের ঋণ নেওয়ার সক্ষমতা ও নিয়মিত কিস্তি পরিশোধের সামর্থ্য নির্ধারণ করা হয়।
ডাউন পেমেন্টে নজর দিতে হবে
বাড়ি বা ফ্ল্যাটের পুরো মূল্য সাধারণত ঋণের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয় না। একটি অংশ নিজস্ব অর্থ থেকে ডাউন পেমেন্ট হিসেবে দিতে হয়। ডাউন পেমেন্ট যত বেশি দেওয়া যায়, ঋণের প্রয়োজন তত কমে। এতে মাসিক কিস্তির পরিমাণ এবং দীর্ঘমেয়াদে সুদের খরচও কমতে পারে।
তাই বাড়ি কেনার পরিকল্পনার শুরু থেকেই ডাউন পেমেন্টের জন্য আলাদা সঞ্চয়ের ব্যবস্থা করা ভালো। তবে ডাউন পেমেন্ট দিতে গিয়ে পুরো সঞ্চয় শেষ করে ফেলা ঠিক নয়। জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য আলাদা অর্থ রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
কিস্তি যেন ভবিষ্যতে চাপ না হয়
হোম লোন দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়। তাই বর্তমান আয় দেখে কিস্তি নির্ধারণ করলেই হবে না, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পরিবর্তনও বিবেচনায় রাখতে হবে। পরিবারের নিয়মিত ব্যয়, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, জরুরি তহবিল এবং ভবিষ্যতের অন্যান্য আর্থিক লক্ষ্য মাথায় রেখে কিস্তির পরিমাণ নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
চাকরি পরিবর্তন, আয় কমে যাওয়া কিংবা নতুন পারিবারিক দায়িত্বের মতো পরিস্থিতি ভবিষ্যতে তৈরি হতে পারে। তাই এমন ঋণ নেওয়া উচিত, যার কিস্তি পরিশোধ করেও দৈনন্দিন খরচ ও সঞ্চয় চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।
ব্যাংকের পরামর্শ কী
এ বিষয়ে প্রাইম ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. নাজিম এ. চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, হোম লোনের পরিমাণ ও মাসিক কিস্তি নির্ধারণে গ্রাহকের আয়, সম্পত্তির মূল্য, প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ, সুদের হার ও ঋণের মেয়াদ বিবেচনা করা হয়। ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নিয়মিত আয়, বিদ্যমান ঋণের দায়, মাসিক ব্যয় ও সামগ্রিক আর্থিক অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, গ্রাহকের শুধু সর্বোচ্চ কত টাকা ঋণ পাওয়া যাবে, তা না দেখে দীর্ঘমেয়াদে স্বাচ্ছন্দ্যে কত টাকা কিস্তি দেওয়া সম্ভব, সেটি হিসাব করা উচিত। প্রাইম ব্যাংকের হোম লোন সর্বোচ্চ ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত এবং সর্বোচ্চ ২৫ বছর মেয়াদে নেওয়ার সুবিধা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে আয়-ব্যয়ের বাস্তবসম্মত বাজেট, জরুরি সঞ্চয় এবং ভবিষ্যতে আয়-ব্যয়ের সম্ভাব্য পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে ঋণের পরিমাণ নির্ধারণ করা জরুরি।
সব মিলিয়ে, বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনা শুধু একটি সম্পত্তি কেনার সিদ্ধান্ত নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনারও অংশ। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের আয়, ব্যয়, সঞ্চয়, ডাউন পেমেন্টের সক্ষমতা, ঋণের সুদ ও কিস্তি এবং আনুষঙ্গিক খরচ—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পরিকল্পনা যত বাস্তবসম্মত হবে, নিজের বাড়ির স্বপ্ন পূরণের পর আর্থিক চাপ সামলানোও তত সহজ হবে।