মধ্যপ্রাচ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে কম। বিশেষ করে ডিজেলের বিশ্বব্যাপী মারাত্মক সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে বলে সতর্ক করেছেন আন্তর্জাতিক বাজারের প্রখ্যাত বিশ্লেষকরা।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তেল শিল্প ও বাজার বিভাগের সাবেক প্রধান নিল অ্যাটকিনসন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, জি-৭ দেশগুলোর জরুরি মজুত থেকে তেল ছাড়ার সাম্প্রতিক পদক্ষেপটি ইতিবাচক হলেও এটি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের মূল ভূরাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়।

যুদ্ধ শুরুর ৭ মাস পরও সংকট তীব্র নিল অ্যাটকিনসন উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার দীর্ঘ ৭ মাস পেরিয়ে গেলেও বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ যুদ্ধপূর্ব অবস্থার চেয়ে ‘উল্লেখযোগ্যভাবে কম’ রয়েছে। বর্তমানে এই সংকটের মূল প্রভাব পড়েছে ব্যবহারিক জ্বালানি অর্থাৎ ডিজেলের ওপর, যা বাজারে নতুন করে বড় চাপ তৈরি করছে।

ডিজেল সরবরাহ হ্রাসের তিন প্রধান কারণ বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে ডিজেলের আন্তর্জাতিক জোগান কমে যাওয়ার নেপথ্যে প্রধানত ৩টি বড় কারণ কাজ করছে:

১. মধ্যপ্রাচ্যের রুট বন্ধ: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও নৌ-পরিবহনে ব্যাঘাতের কারণে ইউরোপীয় দেশগুলো আগের মতো সৌদি আরব ও কুয়েত থেকে প্রয়োজনীয় ডিজেল আমদানি করতে পারছে না। ২. রাশিয়ার রপ্তানি বন্ধ: ইউক্রেনীয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় রাশিয়ার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটি ডিজেল রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। ৩. চীনের সরবরাহ বন্ধ: এশিয়া ও বিশ্ববাজারের অন্যতম শীর্ষ জ্বালানি সরবরাহকারী দেশ চীনও বর্তমান পরিস্থিতিতে ডিজেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ রেখেছে।

কৃষি মৌসুমে চাহিদা বৃদ্ধির আশঙ্কা একদিকে তিনটি বৃহৎ মাধ্যম থেকে ডিজেল সরবরাহ থমকে গেছে, অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে এই জ্বালানির ব্যবহার বা চাহিদা কিন্তু কমেনি। বিশ্লেষক অ্যাটকিনসনের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে বিশ্বব্যাপী কৃষিপণ্যের ফসল কাটার মৌসুম শুরু হওয়ায় সামনে ডিজেলের চাহিদা আরও হু-হু করে বাড়বে। কৃষিকাজে ব্যবহৃত ট্রাক্টর, পাম্প, আধুনিক হারভেস্টার ও পরিবহনব্যবস্থায় ডিজেল ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় এই চাহিদার চাপ কমার কোনো সম্ভাবনা নেই।

জি-৭ মজুতে মিলবে না স্থায়ী মুক্তি জি-৭ জোটের কৌশলগত মজুত থেকে ১০ কোটি ব্যারেল তেল ছেড়ে সাময়িক স্বস্তি আনার চেষ্টা করা হলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুদ্ধের আগের স্বাভাবিক সরবরাহব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করা না গেলে এই ঘাটতি কাটবে না। বিশ্বের প্রধান প্রধান অর্থনীতিতে কৃষি, পরিবহন, ভারি শিল্প ও পণ্য পরিবহনব্যবস্থায় ডিজেলের প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকায় দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট অব্যাহত থাকলে তা আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয় ও সার্বিক খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।