২০২৭ সালের শেষ দিকে বিশ্বজুড়ে নতুন করে বড় ধরনের খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে। আর এর পেছনে অন্যতম কারণ হতে পারে শক্তিশালী এল নিনো। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বা WFP-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এমনই আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, এল নিনোর প্রভাবে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হলে প্রায় ৫ কোটি মানুষ খাদ্য সংকটের মুখে পড়তে পারেন। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া এবং ইউরোপের কিছু এলাকা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এল নিনো কীভাবে এত বড় খাদ্য সংকট তৈরি করতে পারে? এল নিনো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার একটি বড় ধরনের পরিবর্তন, যার প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার ওপর পড়তে পারে। এর ফলে কোথাও স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি হয়ে দীর্ঘ খরা দেখা দিতে পারে, আবার অন্য কোনো অঞ্চলে অতিরিক্ত বৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা হতে পারে। কোথাও আবার বাড়তে পারে চরম তাপমাত্রা। আর আবহাওয়ার এই বড় ধরনের পরিবর্তন সরাসরি আঘাত করতে পারে কৃষি ব্যবস্থায়।
কারণ ফসল উৎপাদনের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে পর্যাপ্ত বৃষ্টি, উপযুক্ত তাপমাত্রা এবং পানির প্রয়োজন হয়। কিন্তু বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে গেলে কিংবা দীর্ঘ সময় খরা চললে কৃষিজমিতে পানির সংকট তৈরি হতে পারে। আবার অতিরিক্ত বৃষ্টি বা বন্যায় জমির ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। চরম তাপমাত্রাও ফসলের ফলন কমিয়ে দিতে পারে। ফলে একই সময়ে একাধিক অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে বাজারে খাদ্যের সরবরাহেও চাপ তৈরি হতে পারে। এই পরিস্থিতির প্রভাব শুধু কৃষকের মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। কোনো অঞ্চলে উৎপাদন কমে গেলে স্থানীয় বাজারে খাদ্যের দাম বাড়তে পারে। আর যেসব দেশ নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে অন্য দেশ থেকে খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাদের ওপরও বাড়তে পারে অতিরিক্ত চাপ।
WFP-এর বিশ্লেষণে খরা, বন্যা এবং চরম তাপমাত্রার কারণে ফসল ও খাদ্যব্যবস্থার ওপর ঝুঁকি তৈরির কথা বলা হয়েছে। ফলে খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি খাদ্য মানুষের কাছে পৌঁছানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও চাপ বাড়তে পারে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকা অঞ্চলগুলোর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং আফ্রিকার কিছু অংশ। এসব এলাকায় কৃষি উৎপাদন আবহাওয়ার ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল হওয়ায় এল নিনোর পরিবর্তিত আবহাওয়ার প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে।
আবহাওয়ার এই প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যেতে পারে, আবার কোথাও দেখা দিতে পারে অতিরিক্ত তাপ বা খরা। এর প্রভাব পড়তে পারে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায়। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি গুরুতর হলে খাদ্যের দাম ও মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও চাপ বাড়তে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে পুরো বিশ্বের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা একেবারে ভেঙে পড়বে। বরং বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকির কথাই বলা হচ্ছে। ফলে ২০২৭ সালের শেষভাগে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন করে বড় খাদ্য সংকট তৈরির ঝুঁকি রয়েছে। আর পরিস্থিতি কতটা গুরুতর হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে এল নিনোর তীব্রতা এবং এর কারণে বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ায় কী ধরনের পরিবর্তন আসে, তার ওপর।