মাত্র ৪০ বছরেই পৃথিবীর দুই মেরু থেকে গলে গেছে প্রায় ১২ ট্রিলিয়ন টন বরফ! আর এই বিশাল পরিমাণ বরফ হারানোর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সমুদ্রের ওপর। ইতোমধ্যেই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়েছে ৩ সেন্টিমিটারেরও বেশি। আর বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, পৃথিবীর তাপমাত্রা যেভাবে বাড়ছে, তাতে সামনে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। দৃশ্যটি গ্রিনল্যান্ডের। একসময় বিশাল সাদা বরফের চাদরে ঢাকা এই অঞ্চল এখন অনেক জায়গাতেই বদলে যাচ্ছে। বরফের জায়গা দখল করছে পানি, তৈরি হচ্ছে নতুন জলরাশি।

উপগ্রহের ছবিতেও ধরা পড়ছে বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা এই পরিবর্তন।নাসা এবং আইপিসিসি -র সাম্প্রতিক গ্লোবাল ক্লাইমেট রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী , গ্রিনল্যান্ডের অন্যতম পরিচিত জ্যাকবশাভন হিমবাহেও সেই পরিবর্তনের স্পষ্ট চিত্র দেখা যায়। বরফ গলতে থাকা এবং হিমবাহের সামনের অংশ ভেঙে সমুদ্রে চলে যাওয়ার কারণে এটি দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে। কিছু পর্যবেক্ষণে প্রতিদিন প্রায় ১৫০ ফুট পর্যন্ত পিছিয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে যে জায়গাগুলো একসময় বরফে ঢাকা ছিল, সেখানেও ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে ভূদৃশ্য।

শুধু গ্রিনল্যান্ড নয়, একই পরিবর্তনের প্রভাব দেখা যাচ্ছে পৃথিবীর অন্য প্রান্ত অ্যান্টার্কটিকাতেও। ১৯৭৯ সাল থেকে দুই মেরুর বরফের স্তর পর্যবেক্ষণ করে গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন, কয়েক দশকে বরফ হারানোর গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আর সব মিলিয়ে এই সময়ে হারিয়েছে প্রায় ১২ ট্রিলিয়ন টন বরফ । কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত বিপুল পরিমাণ বরফ গলে যাচ্ছে কেন? এর পেছনে অন্যতম বড় কারণ পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি। গত প্রায় চার দশকে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সংখ্যাটা শুনতে ছোট মনে হলেও মেরু অঞ্চলের মতো অত্যন্ত ঠান্ডা পরিবেশে এই পরিবর্তনের প্রভাব অনেক বড়। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বরফ জমে থাকার সময় কমছে এবং গলন বাড়ছে।

এখানে শুধু বাতাসের উষ্ণতাই দায়ী নয়। সমুদ্রের পানিও আগের তুলনায় উষ্ণ হয়ে উঠছে। উষ্ণ পানি হিমবাহের নিচের অংশ ও প্রান্তে পৌঁছে বরফ ক্ষয়ের প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত করতে পারে। ফলে ওপর থেকে উষ্ণ বাতাস এবং নিচ থেকে উষ্ণ সমুদ্র দুই দিক থেকেই চাপ তৈরি হচ্ছে মেরু অঞ্চলের বরফের ওপর। আর এই পরিবর্তন শুধু বরফের পাহাড়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। হিমবাহ যখন গলে যায় বা ভেঙে সমুদ্রে মিশে যায়, তখন সেই পানি শেষ পর্যন্ত সমুদ্রের মোট পানির পরিমাণ বাড়ায়। এর ফলে ধীরে ধীরে উপরে উঠছে সমুদ্রপৃষ্ঠ।

সমুদ্রপৃষ্ঠ কয়েক সেন্টিমিটার বাড়াকে হয়তো দূর থেকে খুব বড় পরিবর্তন মনে নাও হতে পারে। কিন্তু উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য এর প্রভাব অনেক বেশি। কারণ সমুদ্রের উচ্চতা যত বাড়বে, জলোচ্ছ্বাস বা শক্তিশালী ঝড়ের সময় পানি আরও সহজে উপকূলের ভেতরে ঢুকে পড়তে পারে। নিচু এলাকার মানুষের জন্য তখন বন্যার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। বিশেষ করে বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ অনেক শহর, দ্বীপ এবং নিচু উপকূলীয় এলাকা এই পরিবর্তনের কারণে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। কোথাও লবণাক্ত পানি ঢুকে কৃষিজমি ও মিঠা পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, আবার কোথাও উপকূল ভাঙনের গতি বেড়ে যেতে পারে।

আর সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, বরফের এই পরিবর্তন একবার শুরু হয়ে গেলে এর প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে। কারণ বরফ হারানো শুধু বর্তমানের সমুদ্রপৃষ্ঠকে প্রভাবিত করে না, ভবিষ্যতের জলবায়ুর ওপরও এর প্রভাব রয়েছে। তাই গ্রিনল্যান্ড কিংবা অ্যান্টার্কটিকার দূরের বরফভূমিতে যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, সেটাকে শুধু মেরু অঞ্চলের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ সেই বরফের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সমুদ্র, উপকূল আর পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ। আজ যে বরফ কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে গলে যাচ্ছে, তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে সমুদ্রের ধারে থাকা মানুষের ঘরবাড়ি পর্যন্ত। আর এই কারণেই বিজ্ঞানীদের কাছে মেরু অঞ্চলের প্রতিটি পরিবর্তন এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।